আমাদের দেশে ‘অর্থ পাচার’ বা Money Laundering শব্দটি শুনলেই মানুষের রক্ত গরম হয়ে যায়। সুইস ব্যাংকের গোপন অ্যাকাউন্ট, বেগম পাড়া, কিংবা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। দুর্নীতিবাজরা দেশের টাকা বাইরে নিয়ে যাচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

কিন্তু এর চেয়েও নিঃশব্দে, গোপনে এবং স্থায়ীভাবে যে পাচারটি আমাদের ভবিষ্যৎ ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে, তা নিয়ে আমরা কজন ভাবি? সেটি হলো মেধা পাচার বা Brain Drain।

একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বুঝতে পারবেন, অর্থ পাচারের চেয়ে মেধা পাচার বহুগুণ বেশি ভয়ঙ্কর। কেন? চলুন যুক্তিগুলো মিলিয়ে নেওয়া যাক।

১. টাকা ফেরত আনা সম্ভব, মানুষ নয়

পাচার হওয়া অর্থ আজ হোক বা কাল, আইনি প্রক্রিয়ায়, আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দেশে ফেরত আনা সম্ভব। এমনকি টাকা ফেরত না এলেও নতুন করে উৎপাদন বাড়িয়ে, রপ্তানি বৃদ্ধি করে বা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়।

কিন্তু একটা মেধা? ২৫-৩০ বছর ধরে একটা দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের ট্যাক্সের টাকায় একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক বা বিজ্ঞানী তৈরি হন। তিনি যখন দেশ ছেড়ে চলে যান, তখন সেই ৩০ বছরের বিনিয়োগ একঝটকায় শূন্য হয়ে যায়। সেই মানুষটিকে কি কোনো আইনি প্রক্রিয়া দিয়ে জোর করে ফেরত আনা সম্ভব? কক্ষনই না।

২. অর্থ পাচার সাময়িক ক্ষতি, মেধা পাচার প্রজন্মগত ক্ষতি

টাকা পাচার হলে সাময়িকভাবে দেশের অর্থনীতিতে তারল্য সংকট দেখা দেয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে টান পড়ে। এটি একটি দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ক্ষতি।

অন্যদিকে, মেধা পাচার হলো একটি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। যখন সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেরা ছাত্ররা দেশ ছেড়ে চলে যান, তখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো শিক্ষক পায় না, হাসপাতালগুলো সেরা চিকিৎসক পায় না, আর নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বসার মতো দূরদর্শী মানুষ থাকে না। এর ফলে পুরো একটি প্রজন্ম মস্তিস্কহীন, অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে পড়ে যায়। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক, এমনকি শতাব্দীও লেগে যেতে পারে।

৩. মেধা পাচার মানে ‘টাকা’ এবং ‘মেধা’ উভয়েরই পাচার

একটি সাধারণ সমীকরণ খেয়াল করুন:

একজন মেধাবীকে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের যে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে, তিনি দেশ ছাড়ার সাথে সাথে সেই রাষ্ট্রীয় অর্থও কিন্তু পরোক্ষভাবে পাচার হয়ে গেল।

শুধু তাই নয়, এই মেধাবীরা বিদেশে গিয়ে যে উদ্ভাবন করছেন, যে ট্যাক্স দিচ্ছেন, তা সমৃদ্ধ করছে অন্য একটি উন্নত দেশকে। অর্থাৎ, আমরা আমাদের সম্পদ খরচ করে অন্য দেশের সম্পদ বাড়িয়ে দিচ্ছি। একে ডাবল ক্ষতি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!

৪. উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হারিয়ে যাওয়া

বলা হয়ে থাকে, প্রাকৃতিক সম্পদ বা টাকা দিয়ে কোনো দেশ উন্নত হয় না, দেশ উন্নত হয় মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে। জাপান বা সিঙ্গাপুরের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ মেলে। তাদের খনিজ সম্পদ বা বিশাল অর্থভাণ্ডার ছিল না, ছিল কেবল মেধা।

আমাদের দেশ থেকে যদি প্রতিনিয়ত সেরা মস্তিস্কগুলো উধাও হয়ে যায়, তবে মেগা প্রজেক্ট করার মতো টাকা থাকলেও, সেই প্রজেক্ট ডিজাইন বা পরিচালনা করার জন্য আমাদের চড়া সুদে বিদেশী বিশেষজ্ঞ হায়ার করতে হবে। আলটিমেটলি দেশের টাকা আবার বাইরেই চলে যাবে।

শেষ কথা: ঘুম ভাঙবে কবে?

অর্থ পাচারকে আমরা ‘ক্রাইম’ বা অপরাধ হিসেবে দেখি, তাই এটি নিয়ে ক্ষোভ আছে। কিন্তু মেধা পাচারকে আমরা অনেক সময় ‘সফলতা’ হিসেবে দেখি! ঘরের ছেলে বা মেয়ে বিদেশে সেটেলড হয়েছে শুনলে আমরা গর্ব বোধ করি। এখানেই লুকিয়ে আছে আসল ট্র্যাজেডি।

যেদিন আমরা বুঝব, একটা ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়ার চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট বা মেডিকেল থেকে একঝাঁক তরুণ গবেষক স্থায়ীভাবে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বেশি বিপজ্জনক—সেদিন হয়তো আমাদের চোখ খুলবে।

টাকা পাচার ঠেকাতে যেমন কঠোর আইন দরকার, তেমনি মেধা পাচার ঠেকাতে প্রয়োজন মেধাবীদের যোগ্য সম্মান, কাজের স্বাধীনতা এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। কারণ, পকেট খালি হলে আবার ভর্তি করা যায়, কিন্তু মাথা খালি হয়ে গেলে সেই জাতি অলস ধড় নিয়ে আর কতদূর এগোবে?